আজ: রবিবার ১০ই চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২৪শে মার্চ ২০১৯ ইং, ১৫ই রজব ১৪৪০ হিজরী

পদার্থ বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার হালচাল

বৃহস্পতিবার, ১৪/০৩/২০১৯ @ ৯:২২ পূর্বাহ্ণ । কলাম

♦ মুহাম্মদ মহসীন চৌধুরী♦
বিজ্ঞান ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না। এমনকি বর্তমান এই প্রযুক্তির বিশ্বে আমরা সেটা কল্পনাও করতে পারি না। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মধ্যে মৌলিক বিজ্ঞানে যিনি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিত তিনি হলেন বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি একাধারে পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ ও অর্থনীতিবিদ ছিলেন। মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী বিশেষ পরিচিতি ছিল তাঁর। বিজ্ঞানে বাংলাদেশকে নতুন পথ দেখানো এই কিংবদন্তি পথিকৃৎ মাত্র ছয় বছর আগে এই গুণী মানুষটি হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা ভাবতেও পারিনি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট লেকচার থিয়েটার হলে সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদ আয়োজিত জামাল স্যারের ৭৪ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেদিনই মহাবিশ্বকে নিয়ে তাঁর মনোমুগ্ধকর বক্তৃতা ও মনোরম সংগীত শুনলাম। এটা হয়তো আমার শোনা তাঁর শেষ বক্তৃতা ও সংগীত পরিবেশনা। বিষয় যাই হোক যত নীরসই হোক তাঁর পরিবেশনা ও কুশলী উত্থাপনের কারণে শ্রোতার কাছে পৌঁছে যেত মর্মবাণী। এ গুণটি তাঁর ছিল, যা সবার থাকে না। তাঁর বক্তব্য পরিবেশনের শৈলীটি বেশ আকর্ষণীয়। কোন সময়ই তাঁকে মাল্টিমিডিয়ার সাহায্য নিতে দেখিনি। চক ডাস্টার আর ব্ল্যাক বোর্ড এই ছিল তাঁর বক্তৃতা দানের উপকরণ। তাঁর বিদগ্ধ পান্ডিত্য ও জটিল বিষয় নিয়ে লিখা সে যোগ্য ব্যক্তি আমি নই। আমার এ লেখা নিতান্তই তাঁর প্রতি আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসার নিবেদন।
জামাল স্যার বিশ্বের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ। বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মনভুলানো পুরুষ। জীবনটা ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণে। বিজ্ঞান ও দর্শনের উৎকর্ষ সাধনে সমাজ-দেশ পৃথিবীব্যাপী মানবসাম্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি একজন দার্শনিক বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন যাবতীয় মানবীয় গুণাবলীতে পুষ্ট একজন পরিপূর্ণ আদর্শ মানুষ। প্রবল দেশপ্রেমের কারণে তিনি ১৯৮৪ সনে বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরী ছেড়ে দিয়ে মাত্র হাজার তিনেক টাকা বেতনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন রিচার্স ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যাড ফিজিক্যাল সায়েন্স নামে একটি গবেষণা সেন্টার। জামাল স্যার গণিত এবং পদার্থ বিদ্যা নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। বেশ কিছু গাণিতিক সূত্র ও জটিল গাণিতিক তত্ত্বের সহজ পন্থা উদ্ভাবন, মহাকাশের উদ্ভব ও পরিণতির বিষয়ে মৌলিক গবেষণার আন্তর্জাতিক মহলেও সুনাম ছড়িয়ে তার লেখা বই অক্সফোর্ড, কেমব্রিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নিভৃতচারী, নিরহংকারী, সহজ-সরল, বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী জামাল স্যার একাধারে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভৌত বিজ্ঞানী, পদার্থ বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতিবিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ, সঙ্গীততত্ত্ববিদ, সেতার বাদক, পিয়ানো বাদক ছিলেন। তিনি ছিলেন সংস্কৃতিবান ও সংবেদনশীল মানুষ। তিনি ছবি আঁকতে পারতেন। তিনি কথামালার ক্যানভাসে রং তুলি দিয়ে সযতেœ একেঁছেন। বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি এ চিত্রকর্মের আবির্ভাব সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ছবি অলংকরণে ছিল তার অত্যন্ত সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। চিত্রে তার বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ ও তীক্ষ্ম সমাজ সচেতনতা ফুটে উঠেছিল। বাসায় নিজের আঁকা অনেক সুকুমার চিত্র তার নিজস্ব লাইব্রেরীতে শোভা পাচ্ছে।
জ্যোতি বিজ্ঞানে গবেষণা ও বিশেষ অবদানের জন্য বিশ্বখ্যাত স্টিফেন হকিংয়ের পর উচ্চারিত হয় জামাল স্যারের নাম।
কেমব্রিজে পাঠ্যসূচিতে জামাল স্যারের গুণে গুণে সাতটি বই অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। প্রগতিশীল বিভিন্ন আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ বিষয়ক এবং সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
অসাধারণ বিশ্বমানের ব্যক্তিত্ব যেমন স্টিফেন হকিং, জোসেফসন ফাইমেন, জিম মারলিস, জন টেলর, ডাইসন, প্রফেসর আবদুস সালাম, হুজিহিরো আরাকি, স্যার মাইকেল আটিয়া, জয়ন্ত নারলিকার, অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সহ আরো অনেকের সাথে ছিল তাঁর পারিবারিক হৃদ্যতা, ছিল অন্তরঙ্গতা। বিদেশে অবস্থান করলে অর্থ যশ খ্যাতি পুরষ্কার সবই পেতেন। দেশের প্রতি প্রবল মমত্ববোধ ও কমিটমেন্টের কারণেই তিনি এমনটাই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, দেশপ্রেম ছিল অগাধ। দেশের শিল্প সাহিত্য নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন।
তিনি বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। জার্মান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত তত্ত্ব জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। আইন ষ্টাইনের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সময় সেখানেই স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে পরিচয়। ক্যামব্রিজে স্টিফেন হকিং তার দুই বছরে নিচের ক্লাসে পড়তেন, সময়ে তারা অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ওই সময় জামাল স্যারের আগ্রহ কসমোলজি নিয়ে।
২০০১ সালে একটি গুজব রটেছিল পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে। ওই সময় সংখ্যাতাত্ত্বিক গণিতের মাধ্যমে তিনি প্রমান করে দেখান যে, পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার সে রকম কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, প্রাকৃতিক নিয়মে সৌরসজগতের সব গ্রহ এক সরলরেখা বরাবরে চলে এলেও তার প্রভাবে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে না। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী চলছে সংকটের ঘনঘটা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। একটার পর একটা সমস্যা আমাদের ওপর ঝাপটা মারছে। মনুষ্যত্বের সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। মানব সমাজের এ পরিণতি দেখে তিনি ব্যথিত, ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতেন। প্রায়ই তার বন্ধুস্থানীয় জ্যোতি পদার্থ বিজ্ঞনী ও ‘আওয়ার ফাইনাল সেঞ্চুরি’র লেখক মার্টিন রিজের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক আলাপচারিতার সূত্র ধরে বলতেন, মার্টিনের আশঙ্কা, বইয়ে তিনি যে পূর্বাভাস ব্যক্ত করেছেন তার আগেই মানব সভ্যতার অবসান হতে পারে। প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যে সর্বত্র পতনের লক্ষণ প্রকট। তা দেখে তিনি সবাইকে সাবধান করতে চাইতেন এবং মানুষের এ রকম পরিণতি অন্তর থেকে মানতে পারতেন না।
জামাল স্যারের লেখা ‘দ্য আলটিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ ছাড়াও ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি, রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু মেথমেটিক্যাল কসমোলজি, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ তার লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ‘দ্য আলটিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ বইটি বের হয় ১৯৮৩ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। বিশ্বের প্রধান কয়েকটি ভাষায় ও অনূদিত হয়েছে তার বই। এসব বই ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তার উল্লেখযোগ্য বাংলা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘কৃষ্ণবিবর’, মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং ‘অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘শিক্ষা’ ‘সাহিত্য ও সমাজ’। তাঁর সহধর্মিণী বাংলাদেশের একজন ইতিহাসবিদ ড. সুরাইয়া ইসলাম। তার দুই মেয়ে সাদাফ ও নার্গিস। বড় মেয়ে ঢাকায় কর্মরত একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ছোট মেয়ে নার্গিস লন্ডনে কর্মরত সাইকোলজিস্ট। ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী ঝিনাইদহ শহরের এক বনেদী পরিবারে জন্ম তার। ‘লালসালু’ উপন্যাসের ¯্রষ্টা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার ফুফাতো ভাই। মা রাহাত আরা ছিলেন উর্দু ভাষার কবি। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটিকা উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুরাগী এই মানুষটির গুণের সীমা নেই। কী দিয়ে মাপব এই সীমাহীন অপরিমেয় ব্যক্তিটিকে? এতদিন আমরা মনে করতাম কসমোলজি মহাবিশ্ব এই সব জটিল বিষয়ে কেবল পাশ্চাত্যের পন্ডিতেরাই কাজ করেন। ধারণা ছিল মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে আর এর সমাধান করতে পারেন পাশ্চাত্যের গুটি কয়েক প্রথম সারির কসমোলজিস্ট। আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং, ফাইম্যান, অ্যালেন গুথ, মাইকেল টার্নার, লরেন্স ক্রাউস প্রমুখ বিজ্ঞানীরাই, আমাদের ভুল ভাঙল। হঠাৎ করেই ১৯৮৩ সালে জামাল নজরুল ইসলাম এক বাঙালী পদার্থবিদের এই বইটি আমাদের নজরে এল- বইটির শিরোণাম ঞঐঊ টখঞওগঅঞঊ ঋঅঞঊ ঙঋ ঞঐঊ টঘওঠঊজঝঊ। পেপারব্যাক বেরোয় ২০০৯ সালে। অবাক বিস্ময়ে আনন্দিত হয়েছিলাম। ১৯৮৩ সাল, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস মহাবিশ্ব বিষয়ক একটি বই প্রকাশ করে। নাম- “দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স”। বইটি রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দেয়। ফরাসি, ইতালিয়, জার্মান, পর্তুগিজ, সোর্বা-ক্রোয়েটসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটি পাঠ্য করা হয়। যার বিষয়বস্তু মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে এই প্রসঙ্গের অবতারণা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ একটা যুগান্তকারী ঘটনা। বিশেষত একজন বাঙালি যদি তা রচনা করেন তবে চমকপ্রদ বৈকি। সাধারণের বোধগম্য এমন বই রচনা তখন বিশাল ব্যাপার। সেই বিশাল কাজটি করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি এমন এক বাঙালি, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক খ্যতি অর্জন করেন পদার্থবিদ, গণিতবিশারদ ও জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসেবে। আন্তর্জাতিক মহলে জে. এন. ইসলাম নামে পরিচিত।
শিক্ষা ও কর্মময় জীবন ঃ জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি অনার্স শেষ করেন। এখান থেকেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিত শাস্ত্রে ট্রাইপস করতে যান। ১৯৫৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে দ্বিতীয়বার ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এখান থেকেই মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬০ সালে। এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৮২ সালে লন্ডনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স অ্যান্ড থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স থেকে পিএইচডি ও ডিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন।
কর্মজীবনে জে. এন. ইসলাম ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল ফেলো ছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কেমব্রিজের ইনষ্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাষ্ট্রোনোমিতে কর্মরত ছিলেন। ষাটের দশকে কেমব্রিজে স্বয়ং পল ডিরাক তাকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্লাস নিতে দেন। ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলোজিতে ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও অধ্যাপনা শেষে ১৯৮৪ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগ দেন। এ প্রসঙ্গে স্যার বলেন, নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং দেশে আসার সিদ্ধান্তে বারণ করে বলেছিলেন জে. এন. ইসলাম তুমি দেশে ফিরে যেও না, তোমার মগজ পঁচে যাবে। তোমার কাছে বিশ্বকে দেয়ার অনেক কিছু আছে। স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রিচার্স সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস [জঈগচঝ] নামে একটি বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইটালীতে নোবেলজয়ী প্রফেসর আবদুস সালামের সাথে টেলিফোন/ফ্যাক্সে যোগাযোগ করতে এক লক্ষ ছয় হাজার টাক খরচ পড়েছিল। তাও স্যারের পিএফ এর হিসাব থেকে। নিজে অনেক হিসাব রাখতে পারেননি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ১ লক্ষ ৬ হাজার টাকার বিলটির মধ্যে সিনেট শুধু ছয় হাজার টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন বিধায় তাকে ১ লক্ষ টাকা প্রদান করতে হবে। অবিমানী স্যার সিনেটের ঐ সিদ্ধান্তে সায় না দিয়ে ১ লক্ষ ৬ হাজার টাকার চেক নিজ ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রদান করেন। বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন নোবেল লরিয়েটর ড. জামাল নজরুল ইসলামের আমন্ত্রণে এসেছিলেন। কমপক্ষে দুবার এসেছেন অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত বন্ধু নোবেল লরিয়েট ড. অমর্ত্য সেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তো নিজেই একজন নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম দিল। বস্তুতপক্ষে ড. আবদুস সালামের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরই অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছে পরিচিত হয়ে গেলেন। ১৯৮৮ সালে অনেকটা অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মৌলিক গবেষণা কেন্দ্র রিচার্স সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স। পরে তার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীন। গড়ে ওঠে নিজস্ব ভবন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মিটিং এ সাবেক উপাচার্য আবু ইউসুফ স্যার দুঃখ করে বলেছিলেন, সবাই শুধু দায়িত্বে যারা থাকে তাদের নিন্দা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ভালো কাজ দেখে না। তখন জামাল স্যার বলেছিলেন, এটা হল থ্যাঙ্কলেস জব, যেখানে ধন্যবাদ পাওয়ার আশায় আপনি কখনোই করতে পারেন না। আপনি যে দায়িত্ব পেয়েছেন এটাই আপনার জন্য সবচেয়ে বড় ধন্যবাদ। কারও কথায় মন খারাপ করবেন না।
১৯৮৯ সালে প্রফেসর আবদুস সালাম কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের [চুয়েট] সিন্ডিকেট সদস্য। এমিরিটাস অধ্যাপক হিসেবে জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে যান তিনি। প্রফেসর আবদুস সালাম বলেছিলেন, এশিয়া থেকে আর কোনো ব্যক্তি নোবেল পেলে তা জামাল নজরুল ইসলাম পাবেন।
জামাল নজরুল ইসলাম রচিত পঞ্চাশটিরও বেশি গবেষণাপত্র রয়েছে। যার অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত জার্নালে। তার গবেষণা প্রবন্ধগুলো জমা দিয়েছেন ফ্রেড হোয়েল, স্টিফেন হকিং, মার্টিন রিজের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা। পঞ্চাশ বছরের বৈজ্ঞানিক জীবনে তিনি ধ্রুপদী সব বিজ্ঞান ধারার ওপর কাজ করেছেন। যথাক্রমে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব, আপেক্ষিকতার সূত্র, নক্ষত্রের গঠন, মহাবিশ্ব তত্ত্ব এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হচ্ছে আপেক্ষিকতাবাদ ও মহাবিশ্ব তত্ত্ব। ড. জামাল নজরুল ইসলাম পিএইডি থিসিস ছিল পার্টিকেল ফিজিক্স বা মৌলিক কণার ওপর। তিনি আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়েও কাজ করেন। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কসমোলজি। মূলত এই তিনটিই ছিল তার আগ্রহ ও কাজের মূলক্ষেত্র। তবে তিনি ফ্লুইড ডায়নামিক্স বা তরল গতিবিদ্যা নিয়েও কাজ করেছেন তার অবদানকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথাক্রমে তাত্ত্বিক কণা, পদার্থবিদ্যা, কনফর্মাল মহাকর্ষ তত্ত্ব, মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ, মহাজাতিক ধ্রুবক লামডা। তারপরও ইউরোপ আমেরিকা প্রথম শ্রেণীর জীবনযাপনের সুযোগ সুবিধা ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে এসে চট্টগ্রামের পাহাড়ি নৈসর্গিক টিলায় জীবন কাটিয়ে গেছেন। ভেবেছেন মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতির কথা, কোটি কোটি বছর পরে কৃষ্ণবিবর শাসিত মহাবিশ্বে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণ বেঁচে থাকে তাহলে এই সূর্যলোকে প্লাবিত পৃথিবী সম্পর্কে কী ভাববে? কিন্তু তবুও তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনকে হয়তো পাওয়া যাবে যাদের কল্পনাশক্তি প্রখর, তার দূর অতীতে, মহাবিশ্বের দিকে ফিরে তাকাবে, দেখবে একটা সূর্যলোক প্লাবিত পৃথিবীকে যেখানে কয়েক কোটি বছরের শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত, তারা সেই পৃথিবী এক স্বপ্নের জগৎ বলেই ভাববে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিভাগে গবেষণা করে অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৬৪ সালে পিএইচডি ও ১৯৮২ সালে সর্বোচ্চ ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রীতে সম্মানিত হন। অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এসসি (এসসি-ডি) উপাধি পেয়েছেন। অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের ‘কৃষ্ণ বিবর’ তথ্য সমৃদ্ধ গ্রন্থ। বিজ্ঞান বিষয়কে গ্রন্থ সাধারণের পাঠোপযোগী করে তোলা সহজ নয়। স্বল্প পরিসরে হলেও এই গ্রন্থে তথ্যের ঘাটতি হয়নি। আধুনিক জ্যোতি বিদ্যার অগ্রগতির সাথে স্যার অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এবং সহজ ভঙ্গিতে আমাদের পরিচয় করে দিয়েছেন। কেমব্রিজে পড়াশুনা করেছেন, ট্রাইপোস করেছেন, পরে পি,এইচ, ডি ও ডি,এসসি করেছেন এবং দীর্ঘদিন সেখানেই শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছেন। মহাবিশ্বের অন্তিম ভাগ্য নিয়ে সুখ্যাতির সাথে আর বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন চুপিসারে। বিদেশ থেকেই শিক্ষকতা গবেষনা চালিয়ে যেতে পারতেন সুনামের সাথে, কিন্তু ১৯৮৪ সালে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন দেশে ফিরে আসার। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি চমৎকার উক্তি আছে, “স্থায়ীভাবে বিদেশ থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না, দেশে ফিরে আসার চিন্তাটা প্রথম থেকেই আমার মধ্যে ছিল, এটার ভিন্নতা ঘটেনি কখনোই। আরেকটা দিক হলো বিদেশে আপনি যতই ভালো থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থান সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব না।” দেশটিকে তিনি বড় ভালবাসতেন। ভালবাসতেন রবীন্দ্র সংগীত ও গজল। আর পিয়ানো বাদন, আর ভালবাসতেন বাংলা ভাষাকে।
পরনির্ভরতায় দেশ আর্থিক ও অন্যান্য দিকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে জামাল স্যার তা বিশ্বাস করতেন না। তিনি সাহায্যকারী/আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপকারী দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, “তোমরা শুধু আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও, আমাদের ভালোমন্দ আমাদেরকেই ভাবতে দাও, আমি মনে করি এটাই সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয়। পদ্মাসেতু নির্মাণে আভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে আই এম এফের খবরদারিকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ হিসেবে মনে করতেন ড. জামাল নজরুল ইসলাম স্যার। তিনি বলতেন একটি স্বাধীন দেশ তার উন্নয়ন কার্যক্রম কিভাবে করবে তা দেশের নিজস্ব ব্যাপার। এখানে বাইরের কোন হস্তক্ষেপ দুঃখজনক। তিনি একটি দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আই এম এফের খবরদারির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামাল স্যার পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে আরো বলেন, আমাদের অর্থনীতি আমরা কিভাবে গড়ব তা আমাদের ব্যাপার, তা নিয়ে আইএমএফ খবরদারি করার কে? আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার এখতিয়ার আই.এম.এফ কেন কারও নেই। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই ক্ষণজন্মা মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে যান চিরতরে ১৬ মার্চ ২০১৩, শনিবার।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার উদ্যোগ নেবার আবেদন জানিয়েছিলেন। দেশে ১৯৮৫ সনে বাংলাদেশ একাডেমী অব সায়েন্সের স্বর্ণপদক, ১৯৯৪ সনে ন্যাশনাল সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি মেডেল, ১৯৯৮ সনে ইতালীর আবদুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী সায়েন্সের মেডেল এবং ২০০১ সনে একুশে পদকে ভূষিত হন। বিজ্ঞান-শিক্ষা ও গবেষণার অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইজিসি) তাঁকে ইজিসি প্রফেসরশিপ প্রদান করেন। মহাবিশ্ব মৌলিক গবেষণা গণিত বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার সব যোগ্যতা তাঁর ছিল।
ব্যক্তিজীবনে অনুকরণীয় সদাচারী, নির্মোহ সতত ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বিভোর এই সুদর্শন মানুষটি যেন কঠিন বিজ্ঞান সাধনা ও লোকমুখী কল্যাণব্রত পালনের জন্য জন্মেছিলেন। তিনি জন্মেছিলেন যেন বিশ্বময় অপরিসীম শ্রদ্ধা ও মর্যাদা অর্জনের জন্যই। দরিদ্র জন ও মাতৃভূমির প্রতি দরদ ছিল তাঁর অন্তর্জাত। বিদেশে উন্নত আয়েশী জীবনের মোহ তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি, তিনি ছুটে এসেছিলেন দেশে নিজের হত দরিদ্র মানুষ ও তাদের সন্তানদের বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নত সেপানে উন্নীত করার জন্য। তিনি সচেতন ছিলেন সমাজ সম্পর্কেও। দেশ-বিদেশী শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। একটি মানবতাবাদী ও সামপ্যপূর্ণ সমাজ ছিল তাঁর লালিত প্রত্যাশা। আমাদের প্রত্যাশা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সমেত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাঁর গবেষণা ও সাধনার ফসল বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে সহজলভ্য করে তোলার সুব্যবস্থা করা হোক। আজকের যুগ বিজ্ঞানের যুগ। নিত্য নূতন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির পথে চলেছে সমগ্র বিশ্ব এবং বিজ্ঞানের এই উন্নতিও হচ্ছে খুব দ্রুত। দেশে সরকারি স্কুলগুলোতেই বিজ্ঞান শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেদিকে নজর নেই। পর্যাপ্ত শিক্ষকই যদি না থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হবেই বা কেন? তাছাড়া সরকারি বেসরকারি অনেক স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও উপযুক্ত পরীক্ষাগার বা ল্যাবরেটারী নেই। এসব অভাব নিয়ে উপযুক্ত বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে দেশকে আর্থ-সামাজিক দিক থেকে উন্নত করতে হলে উন্নত বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি তাদের সরকারগুলো যথেষ্ট নজর রাখে। এমন কি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও বিজ্ঞান শিক্ষাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ যদি এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এদেশের উন্নতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্র বিপর্যয় দেখা দেয়ার আশংকা রয়েছে। তাই সময় থাকতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই” এ সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জামাল স্যার জীবনভর সকল প্রতিকূলতার সাথে লড়ে গিয়েছেন। সমাজের পশ্চাদপদ মানুষের একজন হয়ে তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছেন সমাজের দেয়া অবহেলা অত্যাচার, অতঃপর তিনি নিজেই দ্রোহের আগুনে খাঁটি করে তুলেছেন এবং জীবন ও সমাজকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে মানবতার গগনবিদারী তুর্য ধ্বনি তুলেছেন। বর্তমান সমাজে এমন মানুষের খুবই প্রয়োজন। তবে তার জীবন দর্শন থেকে আমরা সমাজ সংস্কারের দীক্ষা নিতে পারি। তার নির্দেশিত জীবনাচার আমাদের সত্য ও সুন্দরের পথ দেখাবে। ড. জামাল নজরুল ইসলামের মত একজন কান্ডারী শিক্ষাবিদের স্মৃতি প্রকৃতভাবে অবক্ষয়ের যুগে আমাদের চেতনাকে নির্মাণ করবে। অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম উন্নত চেতনার মহৎ উৎকর্ষের আমাদের উত্তরাধিকার।
জামাল স্যার প্রতিটি মানুষের মধ্যে অফুরন্ত সম্ভাবনা দেখতেন। তিনি বলতেন, “শিক্ষার দুরবস্থার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা দায়ী নয়। এর মধ্য দিয়েও আমাদের দেশে বিজ্ঞান চর্চা এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক, এখানে বিজ্ঞানের ছাত্ররা গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনার হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশে বিজ্ঞানের চর্চা এবং এর প্রতি আগ্রহ দেখে অবাক এবং উৎসাহিত হয়েছেন এবং তারাও এদেশের বিজ্ঞান চর্চা একটি মাত্রায় পৌঁছবে বলে মনে করেন। বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে শিক্ষা পরিস্থিতির চেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির নেতিবাচক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা দরকার। এছাড়া বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্ধ কম। তারপরেও বাংলদেশে বিজ্ঞান গবেষণা অনেকটাই ঠিক পথে আছে। সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে উদ্যোগী হলে বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা অনেকটাই এগুবে। বাংলায় বিজ্ঞান বিষয়ক ভালো বই লিখতে হলে প্রথমে ভাল বিজ্ঞানী হতে হবে। এরপর সহজ, সাবলীল এবং সহজবোধ্য বই লেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করা বড় বড় বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করে লেখতে হবে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষকদের বিদেশমুখীতা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে একটা নেতবিচাক দিক- এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এদের সংখ্যা অনেক কম। দেশে বসেও বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা সম্ভব বলে মনে কর্ িঅনেকে দেশেই গবেষণা করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও ভৌত গবেষণার কেন্দ্রের কথাই ধরা যাক। এখানে অনেকেই গবেষণা করছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বমানের গবেষণা করছেন বলে মনে করি। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি স্তর পর্যন্ত বাংলায় বিজ্ঞানের বই লেখা আছে। যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলায় বিজ্ঞান পড়ছেন তারা বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে গেছেন। সুতরাং ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর মাধ্যমে ইংরেজেিত পড়তে সমস্যা থাকার কথা নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রফেসর এমিরিটাস প্রদান করে। অধ্যাপনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠকদেরও প্রেরণা যোগাতেন জামাল নজরুল ইসলাম। দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা ছিল তার।
তিনি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি, রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি, কেমব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিক্যাল ফিজিক্স, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম, সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদ, আলোকিত জাতি ও সুশীল সমাজ বাস্তবায়ন পর্ষদ এর সাথে জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষনা ও বিজ্ঞান আন্দোলনকে একটি সমাজ নির্মাণে তিনি যে স্বপ্ন পোষণ করতেন তা পূরণে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিলেই তাঁর মরণোত্তর মূল্যায়ন হবে। বলা বাহুল্য জামাল নজরুল ইসলাম সমাজ নিয়ে যে চিন্তা করতেন তা খুবই অগ্রসর। তাঁর বিশালত্ব চেনা জানা প্রগতিশীল কথা বার্তায় ধরা পড়বে না। বরং মৌলিক চিন্তার সামাজিক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে পারলেই তাঁকে ঠিকমতো আমরা বুঝতে পারব।

লেখক:
মূখ্য সমন্বয়কারী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গণিত সুবর্ণজয়ন্তী মিলনমেলা পরিষদ,
ম্যানেজার, বেক্সিমকো গ্রুপ, চট্টগ্রাম জোন, এবং
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন রেজিষ্টার্ড গ্র্যাজুয়েট।

সভ্য জাতিসত্ত্বা গঠনে শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে
স্বাধীন বাংলার প্রথম সংবিধান বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষন