আজ: শনিবার ৭ই বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০শে এপ্রিল ২০১৯ ইং, ১৪ই শাবান ১৪৪০ হিজরী

ইসলামী আদর্শ শিক্ষা সংস্কৃতি বিস্তার ও জনহিতকর কর্মে আল্লামা সৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ (রাহ্.) এর অবদান

বৃহস্পতিবার, ২১/০২/২০১৯ @ ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ । কলাম

মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আনোয়ার♦
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চাট্গাঁয় যেসব অলী-বুযর্গ, পীর-মাশায়িখ, আলিমে দীন, ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা ও কৃষ্টি-সভ্যতা বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তাঁদের মধ্যে আল্লামা শাহসূফী ছৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি অন্যতম ক্ষণজন্মা মুহাক্বক্বীক্ব আলিমে দীন ও প্রখ্যাত অলীয়ে কামিল ছিলেন। ইসলাম সঙ্কোচন এবং ইসলামী আদর্শ এবং চিন্তা-চেতনা বিকাশে বিঘœ ও ব্যাঘাত সৃষ্টির এ যুগে তাঁর মত প্রতিবাদী, সাহসী ইসলামী মনীষার প্রয়োজন সমাজবাসীর নিকট তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
তিনি ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলাধীন উত্তর মেখল গ্রামের প্রসিদ্ধ সৈয়্যদ পরিবারে ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর পিতা মৌলভী সৈয়্যদ মুহাম্মদ কবীর হুসাইন (রাহ্) শিক্ষানুরাগী এবং মাতা চুন্নেজান বিবি (রাহ্) দীনদার পরহেয্গার ছিলেন। তাঁদের পূর্বপুরুষ হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন (রাহ্) উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামী আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ হযরত খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী (রাহ্)-এর সাথে ভারতবর্ষে আগমন করেন। তখনকার কোনো এক সময় তাঁর পরামর্শে তিনি সমুদ্র উপকূল চাট্গাঁয় এসে ইসলাম প্রচার-প্রসারে ভূমিকা রাখেন এবং জন্য স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন।
মুবাল্লিগে ইসলাম হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন (রাহ্)-এর বংশ পরম্পরা হযরত আল্লামা শাহ্সূফী সৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ (রাহ্) ভারতের বিখ্যাত সাহারানপুর মাযহারুল উলূম মাদরাসা হতে হাদীসে রাসূল ও ইল্মে ফিক্বহ্-এ উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাযী সৈয়্যদ মুহাম্মদ আযীযুল হক আলক্বাদেরী শেরে বাংলা (রাহ্) তাঁকে মেখল ইমদাদুল উলূম মাদরাসায় নাযিমে আ’লা পদে নিয়োগ দেন। সেখানে তিনি কিছুদিন ইল্মে দীনের ইশা‘আতে ভূমিকা রেখে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে রাউজান উপজেলার গহিরা ‘এফ কে (ফাতিমা খাতুন) জামিউল উলূম মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে স্থায়ী অবদান রাখেন।
তিনি যুব সমাজকে সংগঠিত করে আর্ত-মানবতার সেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে উত্তর মেখল গ্রামে ‘ইমদাদুল ইসলাম সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সমিতির উদ্যোগে ও অনুদানে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, রাস্তা-ঘাট সংস্কার, সেতু-বাঁধ নির্মাণ-পুননির্মাণ, গরীব-অসহায় পরিবারের কন্যা বিবাহে আর্থিক অনুদান, মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চতর শিক্ষা লাভে সহায়তা, আর্ত-পীড়িতদের চিকিৎসাসেবা, বয়স্কদের নৈশশিক্ষা ব্যবস্থাসহ জনহিতকর ও সমাজকল্যাণ কাজে বহু অবদান রাখেন। ‘হিযবুল্লাহ্’ নামে একটি দীনী সংগঠন সৃষ্টি করে এর উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় বহু মসজিদ, মক্তব, মাদরাসা, হিফযখানা, ইয়াতীমখানা প্রতিষ্ঠা, সংস্কার ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। তিনি মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি সমাজবাসীকে ইসলামী তা‘লীম-তারবীয়াত ও তাহ্যীব-তামুদ্দুনে অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি পরিবার ও সমাজে ইসলামি ভাবধারা সৃষ্টিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলিমে দীন ও হাদিয়ে যামান, অলীয়ে কামিল হযরত আল্লামা শাহ্ সূফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ আবদুল হামীদ বাগদাদী (রাহ্)-এর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করে ইল্মে তাসাওউফের গভীরে প্রবেশ করে কামালিয়াত হাসিল করেন। তিনি তাঁর মুর্শিদ ক্বিবলাহ্র শানে এবং তাঁর পীরভাই হযরত শেরে বাংলা (রাহ্) সম্পর্কে বহু ক্বাসীদাহ্ রচনা করেন।
তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ নূরুল মুনাওয়ার (মাদ্দাযিল্লুহুল আলী) পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাকে কামিল হাদীস স্তরে উন্নীত করেন। তাঁর জনতিকর কর্ম, সমাজসেবামূলক কাজ ও শিক্ষা বিস্তারে অবদানের জন্য ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড কর্তৃক হাটহাজারী উপজেলার ইছাপুর হতে তাঁর বাড়ী পর্যন্ত সড়কটি তাঁর স্মরণে ‘আল্লামা সৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ সড়ক’ নামকরণ এবং ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে রাউজান উপজেলার মুনশীর ঘাটা থেকে ফটিকছড়ি উপজেলার কোঠের পাড় পর্যন্ত সড়কটি তাঁর স্মরণে ‘আল্লামা সৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ সড়ক’ নামকরণ করা হয়। তাঁর উত্তরসূরীরা ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ ‘আল্লামা সৈয়্যদ দোস্ত মুহাম্মদ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখে আসছেন। ফাউন্ডেশন কর্তৃক সালানাহ্ র্উসে পাক উপলক্ষে ‘আল্ মুনাওয়ার’ নামে স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়।
তিনি আজীবন শারী‘আত, ত্বারীক্বাত, হাক্বীক্বাত, মা‘আরিফাত, সিয়াসাত, ইনসানিয়াত-এ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ ইন্তিকাল করেন। তাঁকে গহিরা এফকে জামিউল উলূম কামিল মাদরাসা ক্যাম্পাসে দাফন করা হয়। আল্লাহ্পাক সবাইকে তাঁর রূহানী ফায়িয হাসিলে তাওফীক্ব নসীব করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
লেখক : মানবাধিকার গবেষক, ইসলামী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

দেখে এলাম স্পর্শানুভূতির প্রাসাদ : আল্ হামরা
রাউজানে প্রযুক্তির আলো ছড়াচ্ছে যুব উন্নয়ন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র