আজ: বৃহস্পতিবার ৪ঠা মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জানুয়ারি ২০১৯ ইং, ১০ই জমাদিউল-আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

সংসদ সদস্যদের ১৮২জন ব্যবসায়ী
সাংবাদিক সম্মেলনে সুজনের তথ্য

রবিবার, ০৬/০১/২০১৯ @ ২:৩৭ অপরাহ্ণ । জাতীয় শীর্ষ খবর

নিউজ ডেস্ক: একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের ১৮২ জনই (৬১ দশমিক ৭ শতাংশ) পেশায় ব্যবসায়ী। এর মধ্যে মহাজোট থেকে নির্বাচিত পেশায় ব্যবসায়ী আছেন ১৭৪ জন (৬০ দশমিক ৪১ শতাংশ) এবং ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আছেন ৫ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হওয়া ৩ জন পেশায় ব্যবসায়ী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সম্পর্কে এসব তথ্য তুলে ধরে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) । আজ রোববার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর–রুনি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

নির্বাচিত সাংসদদের শিক্ষাগত যোগ্যতা

নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সুজনের তথ্য বলছে, মহাজোট থেকে আসা স্নাতক পাশ সংসদ সদস্য আছেন ১১২ জন এবং স্নাতকোত্তর পাশ আছেন ১২৪ জন। তবে মহাজোট থেকে আসা এসএসসি পাশ করেননি এমন সংসদ সদস্য আছে ১১ জন। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্ট থেকে আসা এসএসসি পাশ করেননি এমন সংসদ সদস্য আছেন ১ জন। আর ঐক্যফ্রন্ট থেকে আসা স্নাতক পাশ সংসদ সদস্য আছেন ২ জন এবং স্নাতকোত্তর পাশ আছেন ২ জন।

হলফনামায় বাৎসরিক আয়ের ঘর পূরণ করেনি ৬ সাংসদ

সুজন বলছে, নবনির্বাচিত ৬ জন সংসদ সদস্য হলফনামায় তাদের বাৎসরিক আয়ের ঘর পূরণ করেনি। তাঁরা হচ্ছেন– সিলেট–২ থেকে মোকাব্বির খান, খুলনা–৩ এর মন্নুজান সুফিয়ান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ–১ এর সালিম উদ্দিন আহমেদ, পঞ্চগড়–১ এর মোজাহারুল হক প্রধান, ঢাকা–১৭ এর আকবর হোসেন পাঠান ফারুক ও কিশোরগঞ্জ–১ এর প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এ ছাড়া প্রার্থী ও নির্ভরশীলদের সম্পদের ক্ষেত্রে নবনির্বাচিত ৪ জন সংসদ সদস্য সম্পদের তথ্য দেননি। তাঁরা হচ্ছেন– কুমিল্লা–৬ এর আ ক ম বাহাউদ্দিন, চাঁদপুর–১ এর মহিউদ্দিন খান আলমগীর, নারায়ণগঞ্জ–৫ এর সেলিম ওসমান এবং কিশোরগঞ্জ–১ এর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই নির্বাচনে অনেক প্রার্থীই তাদের হলফনামা ঠিকভাবে পূরণ করেনি, অসম্পূর্ণ রেখেছেন। অনেকে পেশা উল্লেখ করেননি, সম্পদের হিসেব দেননি। এই অসম্পূর্ণ হলফনামার জন্য তথ্য গোপন করা হয়েছে, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেওয়া হয়েছে।

সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচিত প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, ৩০২ ধারায় বর্তমান ও অতীত উভয় সময়ে মামলায় সংশ্লিষ্ট আছেন ২ জন। একজন মহাজোটের প্রার্থী চট্টগ্রাম–৬ আসন থেকে নির্বাচিত ফজলে করিম চৌধুরী এবং অপরজন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ঠাকুরগাঁও–১ আসনের থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অনেক অযোগ্য ব্যক্তি যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য নন, দণ্ডপ্রাপ্ত এমন ব্যক্তিও নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যারা তথ্য লুকিয়েছেন তাদের মনোনয়ন পত্র গৃহীত হওয়া উচিত নয়। অথচ নির্বাচনে এসব ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে অনেকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে কিংবা সরকারি বেতনভুক্ত কর্মকর্তারা— এ রকম ব্যক্তিরাও নির্বাচিত হয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশনও এই ব্যাপারে কোনো ভূমিকা পালন করেনি। আমরা আশা করব, যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেসবের তদন্ত করা এবং নির্বাচন কমিশনের সে ক্ষমতাও আছে। এমনকি এগুলো তদন্ত করে ইসি নির্বাচন বাতিলও করতে পারে। সে বিষয়ে কোনো রকম উদ্যোগ আমরা দেখছি না।

নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে

নির্বাচনে ভোটের অনিয়মকে ইঙ্গিত করে বদিউল আলম বলেন, ‘যেখানে ইভিএমে ৬টি নির্বাচনী আসনে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে, সেখানে অন্যান্য আসনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কেন পড়লো? এটা কী ইভিএমের সমস্যা নাকি অন্য আসনগুলোতে ভোটের সমস্যা? নির্বাচন কমিশনকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমরা দাবি করছি, তারা জানাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নির্বাচনের দিনটি। নির্বাচনী প্রচারণাকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় ভোটের দিনের পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল। ভোটের দিনে সারাদেশে সহিংসতা পরিলক্ষিত না হলেও সীমিত আকারের সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে কমপক্ষে ১৭ জনের। আহত হয়েছে দুই শতাধিক। এই দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলো, অধিকাংশ এলাকাতেই বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের নির্বাচনের মাঠে অনুপস্থিত। এমনকি বেশিরভাগ কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট-এর অনুপস্থিত।

লিখিত বক্তব্যে সুজন সমন্বয়ক দিলীপ কুমার জানান, নির্বাচনের দিন অনিয়মের অনেক অভিযোগ আমাদের গোচরে এসেছে। অনিয়মগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বা মারধর করে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটের আগের রাতে মহাজোট প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট দিয়ে বাক্স ভরে রাখা, বাইরে থেকে ব্যালট ভরা বাক্স ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা, কোনো কোনো কেন্দ্রে ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, কোনো কোনো ভোটরদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়া, ভোটারদের প্রকাশ্যে সিল মারতে বাধ্য করা, দীর্ঘ সময় লম্বা লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ না করা, কোনো কোনো কেন্দ্রে অস্বাভাবিক বেশি বা কম ভোট পড়া। এছাড়া ভোট পড়ার ক্ষেত্রে ইভিএম-এ ভোটগ্রহণ করা আসনগুলোর সঙ্গে অন্যান্য আসনের অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা গেছে।
সুজন বলছে, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই অনিয়মের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। নির্বাচন চলাকালে ঐক্যফ্রন্টের প্রায় শ’খানেক প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

এক প্রশ্নের জবাবে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কমিশনের উচিৎ সেগুলো তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

নির্বাচন কেমন হলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন, অভিযোগ উঠেছে। আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এগুলো তদন্ত করে এগুলো জানানো। নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের অনেকগুলো অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

প্রার্থীদের বৈধতা নিয়ে আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রার্থীদের বৈধতা নিয়ে আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন যখন প্রার্থিতা বৈধ করে তখন আদালত বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত, তাঁরা হস্তক্ষেপ করবেন না। কিন্তু আমরা দেখেছি, নির্বাচনের একদিন বা দুই দিন আগে পর্যন্ত আদালত প্রার্থিতা বৈধ করেছে, স্থগিত করেছে এবং স্থগিত করে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। এখন এরপরে যদি সেসব স্থগিত হওয়া প্রার্থীরা তাদের প্রার্থিতা ফেরত পায় তাহলে কী হবে? শুধু তাই নয়, পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা আছে, আদালতের কোনো বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ দিতে হবে, শুনতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে যথার্থ নোটিশ দিয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।’

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, একটা ইতিবাচক দিক হলো– এবারের নির্বাচনে অধিক শিক্ষিতরা নির্বাচিত হয়েছেন। বেশি কর প্রদানকারীরা নির্বাচিত হয়েছেন। কতগুলো অশনিসংকেত ও আছে। অধিক ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়েছেন। ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত হয়েছে আমাদের পার্লামেন্ট। নাগরিকদের ভোটাধিকার থাকলেও তাদের প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দিনকে দিন সংকুচিত হচ্ছে।

নির্বাচন কেমন হলো—সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় আমি শুধু নৌকা মার্কার পোস্টারই দেখেছি, ধানের শিষের কোনো পোস্টার দেখিনি। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে অনেক লোকের আনাগোনা দেখেছি। আমি ভোটারদের বলতে শুনেছি, দেখেন ওরা গিয়ে গিয়ে সিল মারছে। এই নির্বাচনে তথ্য সংগ্রহে বাধা ছিল, কোনো উপায় ছিল না।’

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, তবে নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল না। ভোটার হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এটি পাইনি। স্বতঃস্ফূর্ততা না থাকলে একটা নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না বা তাকে সুষ্ঠু বলা যায় না।’

প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকছে ছয় মন্ত্রণালয়
কিশোরগঞ্জে সৈয়দ আশরাফের জানাজায় মানুষের ঢল