আজ: রবিবার ২রা পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং, ৮ই রবিউস-সানি ১৪৪০ হিজরী

পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখবে

বুধবার, ০৫/১২/২০১৮ @ ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ । কলাম

♠ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন ♠

পরিবার হচ্ছে মানবসভ্যতার আদি সংগঠন। পরিবার থেকেই গড়ে উঠে সমাজ। তাই সুন্দর ও সুস্থ সমাজের জন্য আদর্শিক পরিবার অপরিহার্য। পারিবারিক বন্ধন আমাদের গর্ব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পারিবারিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুশিক্ষার যে শক্ত ভিত দাঁড় করিয়েছিল তার উপরই আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। পরিবারের মঙ্গলের জন্য জীবনের সবটা নিবেদিত করেছিলেন আমাদের মা-বাবা, তাদের মা-বাবা এবং তারপূর্ববর্তী বংশধরও। সময়ের পরিক্রমায় এই বন্ধন আজ হুমকির সম্মুখীন। ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবারের আদর্শ, মূল্যবোধ, আর স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন। বাংলাদেশে এক সময়ে পারিবারিক বন্ধন ও পরিবারের সদস্যদের পরস্পর স্নেহ-মমতার যে দৃঢ়তা ছিল তা যেন আজ ম্রিয়মান। যার কারনে পারিবারিক মূল্যবোধ তথা ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়ন ও দ্বন্ধ চরমে পৌঁছেছে। পারিবারিক শিথিল বন্ধন ব্যক্তিজীবনে অস্থিরতার মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে।

বাবা-মায়ের ভালোবাসা আর শাসনের বাইরে গিয়ে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি তা হচ্ছে সন্তানকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া। পারিবারিক অনুশাসন বিচ্ছিন্ন সন্তান নেশাগ্রস্থ কিংবা যে কোন খারাপ অভ্যাসে মত্ত হয়ে বিপথগামী হয়। একজন মানব সন্তান  পারিবারিক শিক্ষা ব্যতীত কখনো আদর্শ মানুষ গয়ে গড়ে উঠতে পারে না। পাশ্চাত্যের দেশে দেশে আজ পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়েছে। আমেরিকার ৭০ শতাংশ বাবা সন্তান নিয়ে একা বাস করেন। বিবাহিতের ৫১ শতাংশ এখন আর ঘর বাঁধেন না। বর্তমানে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান জঙ্গিবাদের মতো ভয়ানক রাস্তায় ধাবিত হচ্ছে। এর অন্যতম কারন হলো তাদের পারিবারিক বন্ধন নেই, যে যার মতো চলাফেরা বা জীবন অতিবাহিত করে। কেই কাউকে পরোয়া করেনা। যৌথ পরিবারগুলোতে দেখা যায় দাদা-দাদী, চাচা-চাচী কিংবা মা-বাবার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকার কারনে সন্তানের ভালো-মন্দ তদারকি করতে পারেন এবং সন্তানের মনেও কোন খারাপ বাসনা সহজে বাসা বাঁধতে পারে না। পারিবারিক বন্ধনের সাথে সাথে একজন ব্যক্তির সাথে সমাজের বন্ধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামাজিক বন্ধন যতই দূর্বল হয় সমাজে ততই বিশৃংখলা বা অশান্তি বাড়তে থাকে। ব্যক্তির সাথে সমাজের বন্ধন যত দৃঢ় থাকবে সামাজিক অনাচার তত কম হবে। সামাজিক বন্ধন যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে সুন্দরের পথে প্রেরণা যুগিয়েছে এবং অসুন্দরের পথ থেকে নিরুৎসাহিত করেছে। সামাজিক এই বন্ধনের শিক্ষা কিন্তু পরিবার থেকেই পেয়ে থাকি। সামাজিক বৈষম্য, ব্যবিচার, মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ সহ সকল প্রকার অপরাধমূলক কর্মকান্ড থেকে মুক্তি পেতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। বন্ধন দৃঢ় হলে জবাবদিহিতা চলে আসে আর যেখানে জবাবদিহিতা থাকে সেখানে অপরাধ প্রবণতা কমে যায়। সামাজিক সম্পর্কহীন বা কম সম্পর্কযুক্ত মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ বা বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়। তাই নিজেকে ভালো রাখার তাগিদেই আমাদের উচিত পরিবার তথা সমাজ থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না করা। সমকালীন সমাজ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পরিবার, পারিবারিক সম্পর্ক অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয়েছে। একটা সময় ছিল শিশুরা যৌথ পারিবারিক পরিবেশে দাদা-দাদী, চাচা-চাচী ও চাচাত ভাই-বোনের মাঝে বড় হতো। পারিবারিক বন্ধন আর শিক্ষা থেকেই সামাজিক বন্ধন, সহমর্মীতা, জবাবদিহিতার শিক্ষা পেত। যৌথ পরিবারের শিশুরা পরিমিত শিষ্টাচার ও সদাচারণের শিক্ষা পেত। ক্ষুদ্র পরিবার বা একক পরিবারের সন্তানরা আজ ক্ষদ্র জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। পরিবার বিমুখীতা তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে এবং ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চিরায়িত সামাজিক বন্ধনও। জীবন-জীবিকার তাগিদে তরুণ-তরুণীরা পরিবার তথা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। জীবনের দীর্ঘসময় বিদেশে থাকার কারনে পরিবারের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ছে, ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হলেও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো থেকে যাচ্ছে তাদের অজানা। অপরদিকে উন্মুক্ত সংস্কৃতির বদৌলতে আজ দেশি বিদেশী বিভিন্ন চ্যানেল ও মিডিয়াতে নাটক বা সিনেমাগুলোতে পারিবারিক বন্ধন বা মূল্যবোধের বিষয়ের চাইতে পারিবারিক কলহের বিষয়গুলোই দেখানো হয় বেশি যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের পরিবার ও সমাজে। তাই আমাদের সকলের উচিত পারিবারিক শান্তি ও সম্প্রীতির মূল্যবোধকে ফিরিয়ে এনে প্রজন্মের সাথে পরিবার ও সমাজের বন্ধনকে আরো দৃঢ় ও মজবুত করা।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

সৌদি আরব।

মানবাধিকার দিবসের ভাবনা
সাংবাদিক হেলাল হুমায়ুন : অতুলনীয় সহকর্মী