আজ: শনিবার ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ই নভেম্বর ২০১৮ ইং, ৮ই রবিউল-আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ডিএসইর বিশেষায়িত তহবিল শেষ, ফুরিয়ে আসছে রিজার্ভও

মঙ্গলবার, ২৭/০৩/২০১৮ @ ৫:২১ পূর্বাহ্ণ । শেয়ার বাজার

নিউজ ডেস্ক: সক্ষমতা না থাকলেও আবারও শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। আর এ লভ্যাংশ দিতে রিজার্ভ তহবিল হাত দিতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হওয়া ডিএসই এবার নিয়ে টানা তিনবার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিল। প্রতিষ্ঠানটিকে তিনবারই রিজার্ভ থেকে অর্থ নিতে হয়েছে।

বছরের পর বছর এভাবে রিজার্ভ ভেঙে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়ায় ডিএসই-এর আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফুরিয়ে আসছে রিজার্ভ তহবিলের অর্থও। ইতোমধ্যে ডেভলপমেন্ট ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ফান্ডের মতো বিশেষায়িত তহবিলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কমে গেছে এফডিআরে বিনিয়োগ। প্রপাটি, প্লান্ট এবং ইকুইপমেন্টের মতো সম্পদে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বছরের পর বছর রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়া উচিত নয়। এতে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কমে যায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত নিয়ম হচ্ছে, মুনাফার সম্পূর্ণ অংশ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ হিসেবে না দিয়ে কিছু অংশ রিজার্ভে রেখে দেয়া হয়। যাতে আপদকালীন সময়ে তা কাজে লাগানো যায়। তবে বছরের পর বছর রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়া উচিত না। এতে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কমে যায়। আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এভাবে রিজার্ভ ভেঙে লভ্যাংশ দেয়া কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না। এতে ডিএসইর আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাছাড়া ডিএসইর ৬০ শতাংশ শেয়ার এখনো ডিস্ট্রিবিউশন করা হয়নি, যা ব্লকড হিসাবে রয়েছে। ৪০ শতাংশ শেয়ারগ্রহকরাই সকল সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি ব্লকড হিসেবে থাকা ৬০ শতাংশ শেয়ার যতক্ষণ পর্যন্ত কৌশলগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেয়া যাবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি নির্দেশনা জারি করা উচিত।

তবে রিজার্ভ ভেঙে লভ্যাংশ দেয়ার পরও ডিএসইর কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এ এম মাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, রিজার্ভ ভেঙে লভ্যাংশ দেয়ার কারণে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, ভবিষ্যতে ডিএসইর আয় বাড়বে। আর এফডিআর এবং প্রপাটি, প্লান্ট এবং ইকুইপমেন্ট কমে যাওয়া এটি তেমন কোনো বিষয় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৮০৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিতে হলে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডিএসই মুনাফা করেছে ১২৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে প্রতিষ্ঠানটির আরও ৫৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা প্রয়োজন, যা রিজার্ভ তহবিল থেকে নেয়া হবে।

আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিএসই রিজার্ভ ভেঙে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে। ওই বছরে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা করে ১১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে রিজার্ভ থেকে নিতে হয় ৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকার মতো। তার আগের বছর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডিএসই মুনাফা করে ১৩৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বছরটিতে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে রিজার্ভ থেকে নিতে হয়েছিল প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১ জুলাই ডিএসইর ডেভলপমেন্ট ফান্ডে ৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ফান্ডে ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ছিল। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রিজার্ভ ভেঙে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়ার কারণে ২০১৬ সালের ৩০ জুন এই দুটি বিশেষায়িত ফান্ডে অর্থের পরিমাণ শূন্য হয়ে যায়। ফান্ড দু’টির অর্থ রিটেন আর্নিংয়ে নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ হিসেবে দেয়া হয়।

এদিকে ডিএসইর রিটেন আর্নিং বা রিজার্ভ তহবিলের পরিমাণ ২০১৫ সালের ১ জুলাই ছিল ২৪৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যা কমে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দাঁড়ায় ২৪২ কোটি ১২ লাখ টাকা। এ অবস্থায় ওই বছর রিভার্জ ভেঙে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়ায় রিটেন আর্নিংয়ের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও রিজার্ভ ভেঙে লভ্যাংশ দেয়ার কারণে এ তহবিলের পরিমাণ কমে দাঁড়াবে ১২৯ কোটি টাকার মতো।

রিজার্ভ তহবিলের পাশাপাশি ডিএসইর এফডিআর’র পরিমাণও কমে গেছে। ২০১৭ সালের ৩০ জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির এফডিআরে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯১ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ১ হাজার ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডিএসইর এফডিআর কমেছে ১২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সালের ৩০ জুন প্রপাটি, প্লান্ট এবং ইকুইপমেন্ট হিসেবে ৪৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা থাকলেও ২০১৭ সালের ৩০ জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা।

এফডিআর এবং প্রপাটি, প্লান্ট ও ইকুইপমেন্ট কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মোট সম্পদেও। ডিএসইর ২ হাজার ৫৩১ কোটি ২৮ লাখ টাকার সম্পদ এক বছরের ব্যবধানে কমে ২০১৭ সালের ৩০ জুন দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮১ কোটি ১০ লাখ টাকায়।

ডিএসইর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৪ কোটি ৯ লাখ টাকা বেশি হয়েছে। ফলে বেড়েছে শেয়ারপ্রতি মুনাফার পরিমাণ। শেয়ারপ্রতি হয়েছে ৬৯ পয়সা, আগের হিসাব বছরে ছিল ৬৬ পয়সা। মুনাফার পাশাপাশি আয়ও বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ের পরিমাণ।

অর্থবছরটিতে প্রতিষ্ঠানটি আয় করেছে ২০৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। যা আগের বছর ছিল ১৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। বরাবরের মতো এবারও ডিএসইর আয়ের প্রধান খাত হিসেবে রয়েছে সুদ ও লভ্যাংশ আয়। তবে এফডিআর কমায় আগের বছরের তুলনায় এ খাতে আয় কমে গেছে। সুদ ও লভ্যাংশ বাবদ আয় হয়েছে ৯০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১১০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

লেনদেন খরার কিছুটা কাটিয়ে ওঠায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লেনদেন চার্জ থেকে আয় কিছুটা বেড়েছে। সেই সঙ্গে ট্রেকহোল্ডারদের কাছ থেকেও আয় বেড়েছে। লেনদেন চার্জ থেকে আয় হয়েছে ৮৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৫২ টাকা ৬৬ লাখ টাকা। ট্রেকহোল্ডারদের কাছ থেকে শেষ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এছাড়া তথ্য বিক্রি ও তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকেও আয় বেড়েছে। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে আয় হয়েছে ২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তথ্য বিক্রি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তবে বিবিধ খাত আয় কমেছে। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডিএসইর ব্যয় হয়েছে ৭৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৬৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত খরচ ৩১ কোটি ১৪ লাখ, সিকিউরিটিজদের পারিশ্রমিক ২৩ লাখ, ভাড়া ও ট্যাক্স ১ কোটি ৯১ লাখ, পরিবহন ১ কোটি ৫৪ লাখ, আইসিটি ১৪ কোটি ৩৪ লাখ, ইউটিলিটিস ৯৩ লাখ, মেরামত ও রক্ষাণাবেক্ষণ ৪১ লাখ, মনিহারি ৬৬ লাখ, বিজ্ঞাপন ৯৪ লাখ, সাধারণ বীমা ১৬ লাখ, বিভিন্ন পরামর্শক ফি ২৬ লাখ, সেমিনার ২ কোটি ৫৬ লাখ, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল ১০ লাখ, অবচয় ১০ কোটি ৫৬ লাখ, ব্যাংক চার্জ ২৭ লাখ, ডব্লিপিপিএফ (ওয়ার্কাস প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড) ৬ কোটি ৭৩ লাখ এবং টেলিফোন, টেলেক্স, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ও ডাকমাসুল খাতে ৩৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। – জাগো নিউজ

আগামী ৫ বছর পুঁজিবাজারের জন্য চ্যালেঞ্জিং: অর্থমন্ত্রী
চীন-ভারত দ্বন্দ্বে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা