আজ: বুধবার ৩০শে কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৪ই নভেম্বর ২০১৮ ইং, ৫ই রবিউল-আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

শব্দদূষণ! প্রসঙ্গ: হাটহাজারী উলামা পরিষদের মাহফিল

রবিবার, ১১/০২/২০১৮ @ ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ । কলাম ফেসবুক সংকলন

♦ সরওয়ার কামাল ♦

গত ফেব্রুয়ারি, রোজ বৃহস্পতি জুমাবার হাটহাজারী উলামা পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুদিব্যপী ইসলামী সম্মেলন। এটাকে কেন্দ্র করে বারবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক টাইম লাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি লেখা। হাটহাজারীর আবু সাহেদ নামের একজন স্ট্যাটাস দিল “এটা কোন মাহফিল না! এটা হল আগামীকাল এসএসসি গণিত পরীক্ষার কোমলমতি পরীক্ষার্থীদের ধ্বংস করার পরিকল্পনা। ফেক্ট: অতিরিক্ত শব্দ দূষণ!” এ স্ট্যাটাসের কমেন্টের ভাষাগুলোও যথেষ্ট তির্যক। কে কী বলছে তার ইয়ত্তা নেই। যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছে। সাধারণত, বিপত্নীক পোস্টে অবাক না হয়ে গত্যন্তর নেই। মাস্ক না সরালেও কন্ঠে তো চেনা যায়। এতে বৈরী মনোভাব কিংবা বিমাতাসুলভ আচরণ প্রকাশ হচ্ছে না তো? সাংবাদিক মানে দর্পণ। শত্রুবন্ধু তাঁর নিকট দুটোই সমান। সে কারো শত্রু নয়, বরং ব্যক্তি, মানবতা, সমাজ রাষ্ট্রের বন্ধু। সাংবাদিকের কোন শত্রু থাকতে নেই। কেননা একজন সাংবাদিক সে সমাজ রাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তার নিজস্ব কোন বক্তব্য থাকে না। যা থাকে তা হয়তো কোন দুর্দশাগ্রস্থ ব্যাক্তির অথবা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের। সে নিজের জীবন বিপন্ন করে সত্যোদ্ধারে বাজিমাত খেলে। কাজেই সাংবাদিক হলো সবার বন্ধু। কিন্তু কেউ যদি নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয় অথবা ক্রোধান্বিত হয়ে কোন ব্যক্তি বা সংঘটনের প্রতি ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, অথবা আক্রোশ বা মনের ঝাল মেটাতে বদ্ধপরিকর হয়ে নিজের ভেতর চাপা পড়া ক্ষোভে নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকেন, তাহলে ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন হবে তা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞমহল ভালো বুঝবেন। দিন আগে এক বন্ধু হাটহাজারী উলামা পরিষদের মাহফিলে মাইকের উচ্চ আওয়াজের কথা উল্লেখ করে বিষয়টিকে `শব্দদূষণনামে অবহিত করেছেন। এটাকে কেন্দ্র করে ফেইসবুক ব্যাবহারকারী বন্ধুদের মাঝে ব্যাপক আলোচনাসমালোচনা হচ্ছে। এক পর্যায়ে এসে শুরু হয় অশালীন মন্তব্য, গালিগালাজ কটুক্তির মহারণ। তির্যকভাষায় আরম্ভ হয় একে অন্যের প্রতি আক্রমণ। অত্যন্ত দুঃখ পরিতাপের বিষয় যে, যখন মুসলিম উম্মাহর সূর্য ডুবে যাওয়ার উপক্রম, এমন মুহুর্তে আমরা পরস্পর কাদা ছুড়াছুড়িতে লিপ্ত। গালাগাল তো কোন মুসলিমের ভাষা হতে পারে না।

অসংলগ্ন শিষ্টাচার বিবর্জিত আচরণ সর্বৈব পরিত্যাজ্য। আচরণে মাধুর্য থাকা চাই এবং যথেষ্ট সংযমী হওয়া উচিত। হতে পারে কোন মাইক যদি নিম্নমুখী হয় কিংবা নিচুতে দেয়া হয় তাহলে দূরের তুলনায় সংশ্লিষ্ট স্থানে আওয়াজ একটুবেশী হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ শব্দেরও গতি আছে। শব্দের গতি যদি কর্ণের লোডিং ক্ষমতার চেয়ে বেশী হয় তা হলে বিরক্তিকর পরিস্থিতি হওয়াটাও স্বাভাবিক। কিন্তু মাহফিলের মাইকের আওয়াজ তো আর বজ্রনিনাদ নয় তবুও কেউ যদি এটাকে শব্দদূষণ বলে মন্তব্য করেন তাহলে তিনি পারমানবিক, রাসায়নিক হাইড্রোজেন বোমা, কিংবা সাউন্ড গ্রেনেড, ট্যাংক, কামান, যুদ্ধ বিমান, যাত্রীবাহী বিমান, হেলিকপ্টার এবং মেঘের গর্জনকে কী দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন? পরন্তু ট্রেন ট্রাকের হুইসেল, ডিজে প্রোগ্রামে ব্যবহৃত সাউন্ড ফিকশন, কতিপয় বাসের কর্কশ ধ্বনি, প্রেস মেশিন, জেনারেটর, ট্রাক্টর, পানির পাম্প, ইট ভাঙ্গানো মেশিন মেলায় বাজানো সাউন্ড বক্সের আওয়াজকে কী বলবেন?

মাহফিলের মাইকের আওয়াজ যদি শব্দদূষণের ক্যাটাগরিতে সন্নিবেশিত হয় তাহলে তো শব্দদূষণের সংজ্ঞাই পাল্টে দিতে হবে। কেননা মাইক সাধারণত ব্যবহৃত হয় বক্তার আওয়াজকে অদূরে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে। মাইকের আওয়াজ সহনীয় পর্যায়ের বলেই সর্বক্ষেত্রে তার ব্যবহার সর্বজন বিদিত। তাছাড়াও বিজ্ঞানীদের লদ্ধ গবেষণামতে মাইকের আওয়াজ সহনশীল পর্যায়ের। কর্ণকুহরের ধারণক্ষমতার সাথে মাইকের আওয়াজের তেমন কন্টিডাকশন নেই বলেও তাঁরা উল্লেখ করেছেন। তাছাড়াও মাইক কেবল মাহফিলে ব্যবহৃত হয় তা নয়। সভাসমাবেশ, কন্ফারেন্স, প্রতিযোগিতা পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন বৃহত্তম ক্ষুদ্র অনুষ্ঠান কিংবা আয়োজনে মাইকের ব্যাবহার একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মাহফিলে ব্যবহৃত মাইকের আওয়াজ শব্দদূষণকথাটি মেনে যদি আমরা সামনে এগিয়ে যাই তাহলে যারা সারারাত মাহফিল করে, অথবা রাত বারোটার পর মাহফিল শুরু করে, কিংবা গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের নামে সারারাত বাদ্যযন্ত্রের বল্গাহীনতা প্রদর্শন করে, বা প্যাকেজ প্রোগ্রামের নামে অশ্লীল নৃত্যগীতের কানফাটা সাউন্ড শুনা যায়, তখন এগুলোকে কী বলবেন?? সর্বোপরি যারা মাযারে উরসের নামে যথেচ্ছা মাইক ব্যবহার করে এবং সারারাত যাতায়াতের পথে বাসের ছাদে মাইক দিয়ে হাসপাতাল, মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ খানকার তোয়াক্কা করে না তাদের ব্যাপারে কী ধারণা পোষণ করবেন??? কাজেই অযথা মন্তব্যের পারাবারে দাঁড়িয়ে কোন লাভ আছে কি? আবার অনেকে এমন রয়েছে যে, তর্কের খাতিরে বিতর্কের জম্ম দেন। বিজ্ঞজন বলেছেন, কথায় কথা বাড়ে। তর্কে প্রতিহিংসার সূত্রপাত ঘটে। প্রতিহিংসা জিগাংসার আগুন সহজে নিভে না। তাই আমরা সংযত হই। শান্তির সমাজ বিনির্মাণে একিভুত হই। হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হই। সত্যকে খুঁজে ফিরে হেদায়াতের মশালে আলোকিত হই

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের সমাদর
‘ভাষার বিশ্বায়ন ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলা চর্চা’