আজ: বুধবার ৩০শে কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৪ই নভেম্বর ২০১৮ ইং, ৫ই রবিউল-আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ঠাকুরগাঁওয়ে মৃৎশিল্পীদের দুর্দিন

সোমবার, ২৩/১০/২০১৭ @ ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ । জনপদের খবর ফিচার

মজিবর রহমান শেখ, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: মৃৎ শিল্প ঠাকুরগাঁও জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। এ শিল্পের সাথে জড়িত কয়েক হাজার হাজার মানুষ। এরা কুম্ভকার বা কুমার নামে পরিচিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের এক শ্রেণীর লোক এদের অন্তর্গত। মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর পাল বংশের কিছু লোকও এ পেশায় নিয়োজিত। কাদামাটি দিয়ে কুমাররা বিভিন্ন আকৃতি- প্রকৃতি এবং সাইজের হাঁড়ি-পাতিল-বাসন-কোসনসহ গৃহস্থালি কাজের উপযোগী নানা দ্রব্য-সামগ্রী তৈরি করেন। হাত এবং চাকার সাহায্যে কাদা মাটি দিয়ে বিভিন্ন দ্রব্য তৈরির পর কাঁচা থাকতে তাতে কাঠি দিয়ে পাতা, ফুল, পাখি ও রেখা টেনে নকশা করা হয়। কখনো আবার দ্রব্যাদি পোড়ানোর পর এতে নানা রঙের সমাবেশে বৈচিত্রপূর্ণ আকষর্ণীয় নকশা করা হয়। খেলার পুতুল ও ঘর সাজানোর শৌখিন দ্রব্যও কুমাররা তৈরি করেন। পাল বা কুমাররা হিন্দুদের বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণ করেন। বাঁশ, খড়কুটা, মাটি, কাপড় ও রঙ দ্বারা নির্মিত এ মূর্তিগুলো এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। কুমার শ্রেণীর সাধারণ মেয়েরা মৃৎশিল্পের নানা দ্রব্য তৈরিতে তাদের পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করে। এতে রয়েছে তাদের সুনিপুণ দক্ষতা ও কুশলতা। ঠাকুরগাঁও জেলা লোকশিল্পের জন্য এক সময় বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে কারখানা থেকে উৎপাদিত দৈনন্দিন গৃহস্থালী সরঞ্জাম বা তৈজসপত্রের সর্বাপেক্ষা বেশী ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যে কারণে মাটির তৈজস পত্রের আবেদন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।  তবে এখনো গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা তাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকে। যেমন হাঁড়ি, কলসি, মটকা, তউন্ডা, বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক, ফুলদানী, সানকি, বদনা, দইয়ের ভাঁড়, ঘটি, মালসা, পাতিল, ছাইদানি ইত্যাদি। এ থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ে লুকাইত মৃৎ শিল্পের একটি পরিচয় ফুটে ওঠে। ঐতিহ্য পরম্পরায় পাল সম্প্রদায়ের মানুষ এ শিল্পের কারিগর। মৃৎ শিল্পের কারিগররা বংশ পরম্পরায় মৃৎ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মৃৎ শিল্পীরা রঙের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে থাকে। যেমন চকের গুঁড়া, তেঁতুল বিচি, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি।  মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় কুমারদের মধ্যে অনেকেই এখন রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি চালানো এবং গার্মেন্ট শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।  পেশা পরিবর্তন করলেও কিছু মানুষ আছে যারা তাদের পৈতৃক এ পেশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক মৃৎ শিল্পের কাজ করে যাচ্ছে। পাল সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়াশুনা করার পাশাপাশি বাড়িতে মা-বাবার সাথে মাটির কাজ করে থাকে। মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিপণনের জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্রির জন্য চলে যায়। নানা ধরনের দেব-দেবী নির্মাণে এ জেলার শিল্পীদের ছিল ব্যাপক সুনাম এবং সুখ্যাতি। দুর্গাপূজা-কালিপূজা, বিশেষ করে সরস্বতী পূজা অত্যন্ত জাঁকজমক এবং আড়ম্বরপূর্ণভাবে এ জেলায় পালিত হয়। পূজা উপলক্ষে শহরে শত শত মন্ডপ নির্মিত হয়। এ জেলায় শিল্পীদের চমৎকার সূক্ষ্মতায় এবং দক্ষতায় নির্মিত এসব মূর্তি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। মৃৎ শিল্পে ব্যবহৃত সহজলভ্য উপকরণ মাটি এখন আর সহজে পাওয়া যায় না, এটি এখন দুষ্প্রাপ্য। ইরি ধানের আগমনে এবং কৃষির আধুনিকায়নে নাড়া খড় এখন পাওয়া যায় না বললেই চলে। শত শত ইটের ভাটায় হাজার হাজার মণ কাঠের ব্যবহারে কুমারের কপালে এখন হাত। তাই এ শিল্পে নিয়োজিত লোকদের আজ বড় দুর্দিন। তা ছাড়া মেলার সংখ্যা কমে যাওয়ায়, গ্রামের মানুষ শহর ও বিদেশমুখী হওয়ায়, তাদের অবস্থা সচ্ছল হওয়ার কারণে মৃৎ শিল্পের ব্যবহারও কমে গেছে বহুলাংশে। সিলভার, স্টিল, স্টেইনলেস স্টিল, প্লাস্টিক, সিরামিক-চীনা মাটির অত্যাধুনিক দ্রব্যাদির চমকের থেকে আলোকে মৃৎ শিল্পের দ্রব্যাদি এবং মৃতপ্রায়। অনেকেই এখন পূর্বপুরুষের পেশাকে বদল করে অন্য পেশা গ্রহণ করছে। অতীতে বিভিন্ন খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, জলাভূমি ইত্যাদি স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করা হতো কিন্তু বর্তমানে দ্রুত নগরায়নের ফলে এসব জলাভূমি, খাল-বিল ভরাট হওয়ার কারণে মাটি সংগ্রহে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে অনেকাংশে। এত দুর্ভোগ সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পের ধারক ও বাহক কুমার সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ এখনো তাদের এই পৈতৃক পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাতে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার মহোৎসব
সাবেক এমপি রুমানার গাড়িতে হামলা